“কল্যাণীকে” শিল্প নগরীতে পরিণত করা পরিকল্পনা ছিল বাংলার রূপকার “বিধানচন্দ্র রায়ের”।বৃহৎ- ভারী শিল্প গঠনের প্রস্তুতি শুরু হলও তা বাস্তবায়িত হয়নি, প্রতিরক্ষা দপ্তরের নির্দেশে। অজস্র ছোট-বড়, সরকারি,বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান এখানে গড়ে ওঠে।” কল্যাণী শিল্পাঞ্চল” আজও স্বমহীমায় প্রতিষ্ঠিত।


সমস্যা তো থাকবেই, এই প্রতিবন্ধকতাকে নিয়েই আজকের কল্যাণী।ঈশ্বরগুপ্ত, বিভূতিভূষণ এর জন্মক্ষেত্র কল্যাণী। বিশিষ্ট জনের বাসভূমীও কল্যাণী।

অধ্যাপক চিকিৎসক ও শিক্ষকদের নিয়ে শুরু হয়েছিল এখানকার পাড়াগুলো।সময়ের সাথে সাথে সবধরনের মানুষ এখানে এসেছেন।মিশে গেছে কল্যাণীর জল,হাওয়া, প্রকৃতির টানে। “পাবলিক লাইব্রেরী”,”টাউন ক্লাব”,”কল্যাণী ক্লাবকে” ঘিরে কল্যানীর যে সংস্কৃতিক বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল তা ত্বরান্বিত হয়েছে ক্রমশ।
আজ কল্যাণীর শিক্ষাক্ষেত্রে,চিকিৎসাক্ষেত্রে দেশের কাজে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শহরের বুকে তৈরি হয়েছে বিনোদনের নানা উপকরণ,বছর ব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের মেলায় সূচিত হয় মেলবন্ধন। “নির্মল নগরী” কল্যাণীতে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে মানুষ।


আশা আমাদেরকে অনেক কিছুই, মহাকুমা শহর কল্যাণীকে নির্বাচিত করার সময় নিজ পরিবর্তন ছিল অনিবার্য।বর্তমানে ২০টি ওয়ার্ড নিয়ে পৌর এলাকা উন্নয়নের প্রকল্পে কাজ করেছে পৌরসভা। প্রাচীন ও নতুনের মিশেলে এগিয়ে চলেছে।এই পথচলা সার্থক হোক। শ্রীবৃদ্ধি হোক শহরের।সার্থক হোক “ডাঃ বিধান রায়ের” স্বপ্ন। শহরের স্বপ্নবাসীর শুভকামনা রইল। সকলের ইচ্ছেতে এগিয়ে চলুক কল্যানী।

ছিন্নমূল মানুষদের ভিড়ে প্রাণ ফিরে পেল “রুজভেল নগর “। এরপরের পর্যায়ে নতুন কল্যাণীর জন্ম। সংস্কৃতির শহর, শিক্ষার শহর, শিল্পের শহর আজকের কল্যাণীর প্রাচীন ইতিহাস নেই ঠিকই কিন্তু সুপ পরিকল্পিতভাবেই আত্মপ্রকাশ করেছিল এই স্বপ্নের শহর। ১৯৫০ সালে কল্যাণীকে ঘিরে তার স্বপ্নকে পরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার কাজ শুরু হয়।
মানসলোকে যে নাম লুকিয়ে ছিল, তাকেই রূপদান করলেন। পরিকল্পনার নকশা করলেন স্থাপিত জে. এন. দাশগুপ্ত। প্রথমে “এ” থেকে “এফ” ছয়টি ব্লকে ভাগ করা হলো এর মধ্যে নির্দেশ করা ছিল কোন ব্লক গুলো শিক্ষাক্ষেত্র, কোনগুলি বসতি, কোনটি বা হবে শিল্পক্ষেত্র। পরিবর্তন কিছু অনিবার্য ছিল। “এ” ও “বি” ব্লক নির্দেশিত হলো বসতি এবং তার অনুষঙ্গের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক এবং বিনোদন ও প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য।
সামরিক ঘাটের ধ্বংসাবশেষ কে মুছে দিয়ে “কল্যাণী” তার অগ্রযাত্রা শুরু করল। কল্যাণী নগরায়ন অন্য মাত্র পেয়েছিল নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধ্যাবসংখ্যা কেন্দ্র কেন্দ্র করে, ১৯৫৪ সালে জাতীয় কংগ্রেসের ৫৯ তম অধিবেশন আয়োজিত হলো কল্যাণীতে।
সভাপতিত্ব করলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু। “বি” ব্লকের
নামকরণ হলো “কংগ্রেস নগর” এখানকার কংগ্রেস রোড এখনো যার সাক্ষ্য বহন করছে । অধিবেশনে যোগদানকারী নেতৃবৃন্দদের জন্য তৈরি হলো কয়েকটি আভাস “বিজয়লক্ষী ভবন” “নেহেরু ভবন”, “বিধান ভবন” যার সাক্ষী। রেলপথ সংস্কার করে তার প্রসার ঘটল। আই.টি.আই. সংলগ্ন অস্থায়ী স্টেশনের নামকরণ হলো- “কংগ্রেস নগর “। সম্প্রসারিত হলো বাস রুট যা ২৭ নং রূপ নামে আমাদের কাছে পরিচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট তৎপর হলেন এশিয়ার পূর্বখন্ডে অক্ষশক্তিকে প্রতিহত করতে শক্তিশালী সামরিক ঘাটি প্রয়োজন। তারই ফলস্রুতি হিসেবে একটি ঘাঁটি তৈরি হলো এই অঞ্চলে। স্বম্পাক্ষর মানুষগুলো সেদিন বোঝেনি কি ভয়ানক বিপদ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। রাতারাতি উচ্ছেদের নোটিশ জারি হয়েছিল। ১৯৪৩ এর ২রা সেপ্টেম্বর ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছিল ৪৫টি গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষদের। সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে ক্ষেত ভরা ফসল ফেলে রেখে জমিদার-প্রজা সবাই পাড়ি দিল অজানার উদ্দেশ্যে। নির্দিষ্ট ছিল না গন্তব্য, নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে গেলেন তারা । ” জমিদার ফকির হলেন”, “চাষী হলেন দিনমজুর”। পরবর্তীতে ও মানুষদের পুনর্বাসন হয়নি।

পরবর্তী প্রজন্ম ও সুখের মুখ দেখেনি। ক্ষতিপূরণও পায়নি। প্রায় ২০ হাজার জমিতে গড়ে উঠেছিল সামরিক ঘাঁটি। প্রাসাদ অট্টিলিকা থেকে চালা ঘর অচিরেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বুলডোজার দিয়ে। হাজার হাজার মার্কিন সেনা উপস্থিত হয়েছিল নবগঠিত “রুজভেল্ট নগরে”। নবরূপে সজ্জিত হয়েছিল এই নগর। সেনাবাস, কংক্রিটের রাস্তা, চাঁদামারি, সামরিক বিমান ক্ষেত্র, পানীয় জলের ট্যাঙ্ক – সব মিলিয়ে সুসজ্জিত নগরী। তৈরি হয়েছিল পৌঁছানোর জন্য রেলপথ, সামরিক হাসপাতাল, মদনপুর ও কাঁচরাপাড়ার মাঝে নির্মিত হয়েছিল অস্থায়ী স্টেশন। পরবর্তীতে এটি স্থানীয় স্টেশন হয় এখন যেটির নাম “কল্যাণী স্টেশন”।
এই নগরের স্থায়িত্বকাল ছিল তিন বছর। যুদ্ধে প্রয়োজন মিটে যাওয়ায় এই নগরীরও প্রয়োজন ফুরিয়েছিল। থেমে যায় গোলাগুলির শব্দ। ঘাটি ভেঙ্গে ফেলার কাজ চলছে থাকে। পড়ে থাকে ধ্বংসাবশেষ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর প্রাণস্পন্দনহীন রুজভেল্ট নগরীর পরিত্যক্ত সম্পত্তি রক্ষা করার দায়িত্বভার নেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু হিন্দু পরিবার এপারে চলে আসেন নিরাপত্তার আশায়। সীমান্তবর্তী নদীয়াতে ও তার ঢেউ এসে লেগেছিল। এই নগরের বিভিন্ন এলাকায় উদ্বাস্তু ক্যাম্প তৈরি হয়েছিল।
বর্তমান কাঁচরাপাড়া উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়া জেলা যেখানে মিশেছে সেই অঞ্চলের গ্রামগুলো নদীয়া জেলার মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এখানেই রয়েছে বর্তমান কল্যাণীর ভিত।





ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট
তৎকালীন এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামে হয় “রুজভেল্ট নগর “
১৯৪৮ সালের কৃষ্ণনগর, কৃষ্ণগঞ্জ, তেহট্ট, রানাঘাট, চাকদহ , হরিণঘাটা, শান্তিপুর এবং হাঁসখালি থানা নিয়ে গঠিত হয়েছিল নদীয়া জেলা। ১৯৬৩ সালে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে চাকদহ থানার কিছু মৌজা নিয়ে “কল্যাণী” নামে নতুন থানা গঠিত হয়। ১৯৮৩ সালে ১লা জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল কল্যাণী মহকুমা।

স্বাধীনতার পরবর্তী যুগের কল্যাণীর নাম সকলেরই জানা। কল্যাণী সুদূর অতীতের চিহ্ন ছড়িয়ে পড়েছিল কয়েকটি গ্রামের মধ্যে। সময় চাকা যে গ্রামের চিহ্ন মুছে দিয়েছে। পূর্ণ কল্যাণী সেই মানচিত্র আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্তমান পরিকল্পিত শহর কল্যাণীর ভিত ছিল সামরিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ৪৫টি কৃষি সমৃদ্ধ গ্রামকে উচ্ছেদ করে ১৯৪৩ সালে এখানেই তৈরি হয়েছিল মার্কিন সামরিক ঘাটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট (ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুবেল)এর নাম অনুসারে তার নামকরণ হয়েছিল “রুজভেল্ট নগর”। ১৯৪৫ এর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সমাপ্তির সাথে সাথে কার্যকারিতা কমেছিল এই নগরের। ১৯৫০ এ সেই পরিত্যাগনগরের ওপরেই পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী “ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের “পরিকল্পনা অনুযায়ী আধুনিক শহর গড়ে তোলার উদ্দেশ্যই রূপ পেয়েছিল বিধান রায়ের স্বপ্নের “কল্যাণী”। তার হাত ধরে কল্যাণীর নগরায়নের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজও প্রবাহমান।





